বিশ বছর আগে, ২০০৬ সালের এক শীতের সকালে আমি প্রথম লন্ডনে পা রাখি। হাতে ছিল একটি পুরোনো সুটকেস, পকেটে মাত্র ২০০ পাউন্ড, আর মনে ছিল অদম্য স্বপ্ন। আজ যখন পেছনে তাকাই, মনে হয় এই কুড়ি বছরের যাত্রা এক আশ্চর্য কাহিনী।
ঢাকার মগবাজার থেকে লন্ডনের ইস্ট এন্ড—এই পথটা সহজ ছিল না। প্রথম বছরগুলো ছিল সংগ্রামের। রেস্টুরেন্টে ওয়েটার হিসেবে কাজ শুরু করি, পরে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। দিনে কাজ করতাম, রাতে পড়তাম। ২০০৮ সালে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স শেষ করি।
"প্রবাস জীবন মানে শুধুই টাকা পাঠানো নয়। এটা একটা নতুন সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়া, নিজেকে গড়ে তোলা, আর দেশকে ভালোবাসতে শেখা।"
সাংবাদিকতা আমার স্বপ্ন ছিল ছোটবেলা থেকেই। লন্ডনে এসে সে স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাই। ২০১০ সালে 'বাংলা ভয়েস' নামে একটি কমিউনিটি রেডিও চ্যানেল চালু করি। পরে এটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে পরিণত হয়। এখন আমরা ১৫ জনের একটি টিম নিয়ে কাজ করছি।
প্রবাসী জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধৈর্য ও সহনশীলতা। প্রথম দিকে ভাষাগত সমস্যা, সাংস্কৃতিক ধাক্কা, বর্ণবাদের মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু কখনো থেমে থাকিনি। আমার মা বলতেন, "যেখানে থাকবি, সে জায়গার মাটিকে নিজের করে নিবি।"
পরিবারকে মিস করাটা প্রবাসী জীবনের আরেক বড় বাস্তবতা। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও যেতে পারিনি। ইদ-উল-ফিতরে একা একা কেঁদেছি। কিন্তু এসব কষ্টই আমাকে শক্ত করেছে। এখন আমার স্ত্রী ও দুই সন্তান লন্ডনেই থাকে। ওরাই আমার নতুন সংসার।
নতুন প্রজন্মের প্রবাসীদের বলতে চাই—ভয় পেও না। শুরুতে কষ্ট হবে, কিন্তু সেটাই তোমাকে তৈরি করবে। টাকা আয় করা জরুরি, তবে পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জন করাটা আরও জরুরি। আর হ্যাঁ, দেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে ভুলো না।
আমার কাছে প্রবাস জীবন মানেই দুই দেশকে ভালোবাসা। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি, যুক্তরাজ্য আমার কর্মভূমি। দুটোই আমার পরিচয়। এই কুড়ি বছরে আমি শিখেছি—সফলতা মানে শুধু অর্থ উপার্জন নয়, বরং মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।